বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে পবিত্র আল কোরআনের গুরুত্ব!
লেখক: সিরাজুর রহমান
মানবজাতির মুক্তি ও সঠিক পথপ্রদর্শনের জন্য মহান আল্লাহ সর্বশেষ আসমানি কিতাব
হিসেবে পবিত্র আল কোরআন নাজিল করেছেন আজ থেকে প্রায় ১৪শ বছর আগে। এই মহাগ্রন্থ কেবল
একটি নৈতিক ও মানবিক সমাজ গড়ার দিকনির্দেশনাই দেয় না, বরং ইতিবাচক জ্ঞান, বিজ্ঞান ও
প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকেও মানুষকে ধাবিত করে।
পবিত্র আল কোরআন শুধু মানবজাতির আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মুক্তির গাইডলাইন নয়, বরং
এটি মানুষকে চিন্তা ও গবেষণার খোরাক জোগায় এবং একটি বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক
দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করে। ইসলামে অন্ধবিশ্বাসের কোনো স্থান নেই; বরং জ্ঞান
অন্বেষণ ও মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্য উন্মোচনকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের আলোকে শিক্ষা অর্জন করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
কাজ। মহান আল্লাহ বলেন, “পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন” (সূরা আলাক: ১)।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর এই প্রথম নির্দেশই জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে তুলে
ধরে। তাই একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো পবিত্র কোরআন পড়া, তার অর্থ অনুধাবন
করা এবং গভীরভাবে অধ্যয়ন করে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা।
পবিত্র কোরআন আমাদের কেবল আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনাই দেয় না; এটি মানবতা, সহনশীলতা
এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে। এর শিক্ষার আলোকে আমরা এমন একটি জীবনব্যবস্থা
গড়ে তুলতে পারি, যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা একে অপরের পরিপূরক
হিসেবে কাজ করে।
পার্থিব ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের ক্ষেত্রেও
পবিত্র আল কোরআনের বহু আয়াত ও নির্দেশনা মানবজাতির সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
বিশেষ করে চৌদ্দশ বছর আগে অবতীর্ণ পবিত্র কোরআনে এমন অনেক বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত ও বর্ণনা
রয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞানের অনুসন্ধানের সঙ্গে অনেকটাই সঙ্গতিপূর্ণ।
এটি কেবল পাঠযোগ্য একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; বরং বিশ্বজগতের সৃষ্টি, ভ্রূণবিজ্ঞান,
জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং পদার্থবিদ্যার মতো মৌলিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে শত শত বৈজ্ঞানিক
ইঙ্গিত ও সত্য অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছে। একজন মুসলিম হিসেবে এসব নিয়ে আমাদের
নিয়মিত অধ্যয়ন ও গবেষণা করা উচিত।
মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ নিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, “আমি মহাকাশসমূহকে আমার ক্ষমতা
দ্বারা সৃষ্টি করেছি এবং আমিই তা সম্প্রসারণকারী” (সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৪৭)। আধুনিক
জ্যোতির্বিজ্ঞানও প্রমাণ করেছে যে মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।
মহাবিশ্বের সূচনা নিয়ে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “কাফেররা কি ভেবে দেখে না
যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সব কিছু মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে, অতঃপর আমি উভয়কে আলাদা করে
দিলাম?” (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩০)। এই আয়াতটি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিগ ব্যাং
(Big Bang) তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথ নিয়ে বলা হয়েছে যে, “আর তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত্রি
ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে” (সূরা আল-আম্বিয়া,
আয়াত: ৩৩)। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে সূর্য ও চন্দ্র স্থির
নয়, বরং মহাশূন্যে নির্দিষ্ট গতিতে নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে।
ভ্রূণবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মানুষের সৃষ্টির পর্যায়ক্রম নিয়ে বলা হয়েছে, “এরপর
আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করি,
অতঃপর সেই মাংসপিণ্ড থেকে অস্থিপঞ্জর সৃষ্টি করি, অতঃপর অস্থিপঞ্জরকে মাংস দ্বারা আবৃত
করি—অতঃপর আমি তাকে এক নতুন
সৃষ্টিরূপে দাঁড় করাই” (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ১৪)। আর মায়ের পেটে মানব ভ্রূণের গঠনের
এই পর্যায়ক্রম আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
ভূতত্ত্বের ক্ষেত্রে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “আমি পৃথিবীতে
সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছি, যাতে পৃথিবী তাদের নিয়ে ঢলে না পড়ে” (সূরা আল-আম্বিয়া,
আয়াত: ৩১)। ভূতত্ত্ব অনুযায়ী পাহাড়গুলো প্লেট টেকটোনিক (Plate Tectonics) প্রক্রিয়ায়
পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করে এবং ভূত্বককে স্থিতিশীল রাখে।
জীবনের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, “আর আমি প্রত্যেক জীবন্ত বস্তুকে
পানি থেকে সৃষ্টি করলাম” (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩০)। আধুনিক বিজ্ঞানও স্বীকার করে
যে জীবনের মূল ভিত্তি হলো পানি এবং প্রতিটি জীবের মূল উপাদান প্রোটোপ্লাজমে পানির উপস্থিতি
অপরিহার্য।
এ ছাড়া ইতিহাস সাক্ষী। মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্বই ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু।
ইবনে সিনা, আল-খাওয়ারিজমি, ইবনে আল-হাইসাম, আল-বিরুনির মতো মনীষীরা চিকিৎসাবিজ্ঞান,
গণিত, আলোকবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে যে ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন, তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে
আজকের আধুনিক বিজ্ঞান ও উন্নত সভ্যতা।
তবে হতাশাজনক হলেও সত্য যে, কালের পরিক্রমায় মুসলিম বিশ্ব আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত
উন্নয়নে অগ্রযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোরআনের “পড়ো” নির্দেশকে আমরা কেবল
পাঠে সীমাবদ্ধ রেখেছি, অনুসন্ধান ও গবেষণায় রূপ দিতে পারিনি।
আজ মুসলিম বিশ্বের পিছিয়ে পড়ার পেছনে কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কারণ নয়,
বরং পারস্পরিক অনৈক্য, মানসম্মত শিক্ষার অভাব এবং গবেষণা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ঘাটতিও
অন্যতম কারণ। আমরা অনেকেই হয়তো ধর্ম ও বিজ্ঞানকে পরস্পরবিরোধী মনে করি, অথচ পবিত্র
কোরআন বারবার মানুষকে ইতিবাচক চিন্তা, অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধানের পথে আহ্বান
করে।
তাই পরিশেষে বলা যায়, পবিত্র কোরআনের এই বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত ও সত্যগুলো প্রমাণ
করে যে এই মহাগ্রন্থের উৎস ঐশ্বরিক। মহান আল্লাহ প্রেরিত পবিত্র আল কোরআনের মর্মবাণী
অধ্যয়ন ও চর্চার মধ্য দিয়েই মুসলিম বিশ্বকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পথে এগিয়ে
নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কেবল অতীত গৌরবের বর্ণনা নয়, বরং কোরআনের অনুসন্ধানী
চেতনাকে জাগিয়ে তোলা এবং গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে এগিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েই মুসলিম
উম্মাহর হারানো ঐতিহ্য ও শক্তি ফিরে পাওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র:
১. পবিত্র আল কোরআন (সূরা আলাক: ১; সূরা আয-যারিয়াত: ৪৭; সূরা আল-আম্বিয়া:
৩০, ৩১, ৩৩; সূরা আল-মুমিনুন: ১৪)
লেখক পরিচিতি: সিরাজুর রহমান, সহকারী শিক্ষক, বিনগ্রাম উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।
%20(1).png)
Comments
Post a Comment