বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বাস্তবায়নে প্রয়োজন ইতিবাচক ও পরিকল্পিত পরিবর্তন
লেখক: সিরাজুর রহমান
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক জানিয়েছেন,
আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য চতুর্থ শ্রেণি
থেকে খেলাধুলা এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষাকে জাতীয় কারিকুলামের মূল অংশ হিসেবে
বাধ্যতামূলক করা হবে। আর দক্ষতার সঙ্গে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে এটি বাংলাদেশের
শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গঠনমূলক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
বিশেষ করে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ড
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ
মোকাবিলা এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে প্রাথমিক স্তর
থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি ইতিবাচক আগ্রহ তৈরি করাও এখন খুবই জরুরি।
আসলে আমাদের দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের সবাইকে বিজ্ঞানী
বা প্রকৌশলী বানানোই মূল লক্ষ্য নয়; বরং তাদের মধ্যে প্রশ্ন করার মানসিকতা, যৌক্তিক
চিন্তা, পর্যবেক্ষণ, সমস্যা সমাধান এবং নতুন কিছু শেখার ও জানার আগ্রহ তৈরি করাই বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
এক্ষেত্রে চীন ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। সাম্প্রতিক
সময়ে চীন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই কোডিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও
সৃজনশীল গণিতকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করেছে। দেশটিতে বর্তমানে মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে
হাতে-কলমে শেখা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
বেইজিং শিক্ষা কমিশন সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের অন্তত ১০
শতাংশ সময় STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত) শিক্ষায় ব্যয় হবে এবং মাধ্যমিকে
পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। চীনের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের
আধুনিক ল্যাবগুলোও ইতোমধ্যেই স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে চীনের পাশাপাশি ভিয়েতনামও সম্প্রতি প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত
সীমিত পরিসরে এআই শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন এই ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী,
প্রাথমিক স্তরে ডেটা সুরক্ষা, মাধ্যমিকে এআই টুলের ব্যবহার এবং উচ্চমাধ্যমিকে নিজস্ব
প্রকল্প তৈরি ও প্রযুক্তিনির্ভর ক্যারিয়ার ভাবনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার
মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও দায়িত্বশীল ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
তাই চীন ও ভিয়েতনামের পরিকল্পিত শিক্ষানীতির অনুকরণে বাংলাদেশেও নতুন শিক্ষা
কারিকুলামে সীমিত পরিসরে হলেও প্রাথমিক স্তর থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান, সহজ প্রযুক্তি
শিক্ষা, সৃজনশীল প্রকল্প এবং হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা
পাঠ্যবইনির্ভর জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যা সমাধানের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে এবং দক্ষ
নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
এক্ষেত্রে আমাদের দেশের কারিগরি শিক্ষাকে এখন শুধু সনদ বা পরীক্ষার ফলাফলের
মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক কর্মজগতের চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষা
ব্যবস্থা গড়ে উঠলে এর সুফল হবে আরও ইতিবাচক এবং টেকসই।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স ও স্বয়ংক্রিয়
প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ব্যবস্থায়
খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি বয়স ও স্তর অনুযায়ী
হাতে-কলমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে
Industry-Academia Linkage এবং Vocational Education, Training and Research
Center প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একাধিক ইতিবাচক ও গঠনমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে
Huawei ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের Confucius Institute-এর মধ্যে তরুণদের Artificial
Intelligence দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এসব ইতিবাচক উদ্যোগ ও পরিকল্পনা বাংলাদেশে প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার
নতুন সুযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এক্ষেত্রে চীনের শিক্ষাব্যবস্থা
আমাদের হুবহু অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই; বরং তাদের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের বাস্তবতা,
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়গুলো গ্রহণ করার
ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এখন আধুনিক ও বিশ্বমানের শিক্ষা বাস্তবায়নে আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন
একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী,
সৃজনশীল, যুক্তিবাদী ও উদ্ভাবনী মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে। এতে ভবিষ্যতে দক্ষ গবেষক,
প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ ও সফল উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী
হবে।
অতএব, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার সকল স্তরে দেশের সরকার,
শিক্ষক, অভিভাবক ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পর্যাপ্ত
বিনিয়োগ ও টেকসই পরিকল্পনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই বিজ্ঞানমনস্কতা,
প্রযুক্তি-সচেতনতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বিত বিকাশই হতে পারে একটি জ্ঞানভিত্তিক
ও উদ্ভাবনী বাংলাদেশ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।
তথ্যসূত্র:
১. প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার
২. বেইজিং শিক্ষা কমিশন, STEM শিক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা
৩. ভিয়েতনাম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ মন্ত্রণালয়, AI শিক্ষা ফ্রেমওয়ার্ক
লেখক পরিচিতি: সিরাজুর রহমান, সহকারী শিক্ষক, বিনগ্রাম উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।
Comments
Post a Comment