ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রযুক্তিতে নীরবে বিপ্লব ঘটিয়েছে চীন
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও চাপকে উপেক্ষা করে ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় কৌশলগত সাবমেরিন-উৎক্ষেপিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (SLBM) পরীক্ষা চালিয়েছে চীন। পানির নিচে লুকিয়ে থাকা নিউক্লিয়ার সাবমেরিন থেকে চালানো চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষায় জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড প্রবল উদ্বেগ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
তবে এই উৎক্ষেপণে বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট নাম প্রকাশ করেনি। সামরিক বিশ্লেষক ও তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছিলচীনের অত্যাধুনিক ১০ হাজার কিলোমিটার রেঞ্জের জুলাং সিরিজের (সম্ভবত JL-2 বা JL-3) সাবমেরিন-বেসড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (SLBM)।
আন্তর্জাতিক জলসীমায় সাবমেরিন থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়ে বেইজিং মূলত বিশ্বের কাছে তাদের "অ্যাসিওর্ড সেকেন্ড-স্ট্রাইক" (Assured Second-Strike) বা পাল্টা পারমাণবিক আঘাত হানার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বতেও চীন আন্তর্জাতিক জলসীমায় স্থলভিত্তিক ডংফেং-৩১ (DF-31AG) ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM) পরীক্ষা চালিয়েছিল।
প্রকৃতপক্ষে, চীনের ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচির সূচনা হয় ১৯৬০-এর দশকে। চীন প্রথমে DF-4 (৭,০০০ কিমি) তৈরি করলেও বাস্তবে তা মূলত একটি ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ ব্যালিস্টিক মিসাইল (IRBM) ছিল। আর চীনের প্রথম সফল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল হচ্ছে তরল জ্বালানিচালিত ডিএফ-৫ (DF-5), যার পাল্লা ছিল প্রায় ৯,০০০ কিমি। বর্তমানে চীনের সর্বাধুনিক ল্যান্ড-বেসড ICBM হলো কঠিন জ্বালানিচালিত DF-31 (৭,২০০–১৩,২০০ কিমি) এবং DF-41 (১২,০০০–১৫,০০০ কিমি)।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তির তুলনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যান্ড-বেসড ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল (ICBM) হিসেবে ১৩,০০০ কিমি পাল্লার 'মিনিটম্যান ৩' এবং রাশিয়ার কাছে রয়েছে ১৮,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লার সুপার-হেভি 'আরএস-২৮ সারমাট' মজুত রয়েছে।
বর্তমানে সারা বিশ্বের মাত্র কয়েকটি দেশের কাছে এমন সক্রিয় ল্যান্ড-বেসড ICBM প্রযুক্তি রয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত ও উত্তর কোরিয়া অন্যতম (ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য মূলত সাবমেরিন-বেসড ক্ষেপণাস্ত্র বা SLBM প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল)।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চীনের কাছে বর্তমানে প্রায় ৫০০–৬০০টি নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড এবং অন্তত ৩৫০টির বেশি বিভিন্ন রেঞ্জের ও সক্ষমতার ICBM মিসাইলের বিশাল মজুত রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের মতে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যেচীনের নিউক্লিয়ার ও থার্মোনিউক্লিয়ার ওয়ারহেডের সংখ্যা আনুমানিক ১,০০০-এ পৌঁছাতে পারে।
যদিও বর্তমানে সামগ্রিক সংখ্যার দিক থেকে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পরমাণু মজুতের তুলনায় অনেক কম, তবুও চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক আধুনিকীকরণ ও দ্রুত পরমাণু অস্ত্র বৃদ্ধির এই প্রবণতা তাদের বৈশ্বিক সামরিক উচ্চাভিলাষ ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লড়াইয়েরই স্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কেবল এই পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করেই ICBM প্রযুক্তিতে চীন বিশ্বের অন্যান্য পরমাণু পরাশক্তিকে ছাড়িয়ে একেবারে শীর্ষে পৌঁছে গেছে—এমনটা মনে করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, রয়টার্স, গ্লোবাল টাইমস, এনবিসি।
সিরাজুর রহমান,
শিক্ষক ও লেখক, সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।
Comments
Post a Comment