বৈশ্বিক সংকটের মাঝেও ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি!



বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে অস্থিরতা বিরাজ করছে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং লোহিত সাগরসহ প্রধান বৈশ্বিক নৌপথে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে। তবুও বর্তমানে বৈশ্বিক ইলেকট্রিক, ইলেকট্রনিক্স ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে ইতিবাচক ও শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে।

 

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ সংস্থা Research and Markets-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালে গ্লোবাল ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড ইলেক্ট্রিক শিল্প খাতের আকার ছিল প্রায় ৪.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালে ৪.৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে ৬.৯% হারে বাজার আকার প্রায় ৫.৬১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

চীন বর্তমানে বৈশ্বিক উৎপাদন খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ২০২৫ সালে একাই প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারের ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে ভিয়েতনাম ১০৭.৭৫ বিলিয়ন ডলার, ভারত ৩৮.৫ বিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া ২৬৪.২৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য এই বিপুল উৎপাদনের প্রধান আমদানিকারক ও ভোক্তা হিসেবে গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পখাতের বাজার সচল রেখেছে। যদিও বাস্তবে উচ্চ প্রযুক্তি সিস্টেম ডিজাইন ও তৈরিতে সারাবিশ্বকে এখনো পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

 

আসলে বৈশ্বিক পর্যায়ে অতি সম্ভাবনাময় ইলেকট্রনিক ও ইলেক্ট্রিক পণ্য উৎপাদন ও এক্সপোর্ট মার্কেটে বাংলাদেশও এখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও বাস্তবে ৪.৩ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের এই খাতের বৈশ্বিক বাণিজ্যের খুবই সীমিত পরিমাণ বা অংশ নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ।

 

বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইলেকট্রিক্যাল পণ্য রপ্তানিতে প্রায় ২৩.৮২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যার মূল্য ২০৬.১৯ মিলিয়ন ডলার। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৫২.১৫ মিলিয়ন ডলার। তৈরি পোশাকের পর এই খাতকে এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

বর্তমানে আমাদের দেশের দক্ষ উদ্যোক্তারা ইতোমধ্যে শতভাগ স্থানীয়ভাবে তৈরি রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন ও এয়ার কন্ডিশনার সফলভাবে উৎপাদন করছেন এবং ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার ২০টিরও বেশি দেশে “মেড ইন বাংলাদেশ” ট্যাগ নিয়ে রপ্তানি শুরু করেছেন। এটি দেশের জন্য অবশ্যই গর্বের বিষয়।

 

বর্তমানে আমাদের শিল্প সেক্টরে উৎপাদিত ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক পণ্যের কাঁচামাল, উপাদান ও প্রযুক্তির জন্য এখনো অন্যান্য দেশের আমদানির ওপর বহুলাংশে নির্ভর করতে হয়। যা এই খাতে আমাদের জন্য একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তবে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যেতে পারলে এই খাত থেকেও প্রায় ২-৩ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় করা সম্ভব।

 

তাই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কাঁচামাল ও প্রযুক্তির আমদানিনির্ভরতা কমানো, কার্বন-ফুটপ্রিন্ট ট্র্যাকিং, লজিস্টিক স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ল্যাব গড়ে তোলা জরুরি। এছাড়া দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সার্টিফিকেশন অবকাঠামো না থাকায় তারা বিশ্ববাজারে প্রবেশে বাধার মুখে পড়ছে।

 

তবে আশার কথা হলো যে, আমাদের বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা’ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক ছাড়, কর অবকাশ ও ক্যাশ ইনসেনটিভ ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে এবং বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত করতে সহায়তা করবে ইনশাআল্লাহ।

 

তথ্যসূত্র:

১. Research and Markets / The Business Research Company

২. Ministry of Trade, Industry and Energy (MOTIE), South Korea

৩. General Department of Vietnam Customs

৪. The Economic Times (CIO India)

৫. Export Promotion Bureau (EPB) / The Business Standard

 

লেখক পরিচিতিঃ

সিরাজুর রহমান

শিক্ষক ও লেখক

সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।


Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ছাপানো পবিত্র কুরআন মাজীদ!

বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর কৌশলগত ব্যালিস্টিক মিসাইল ও পরমাণু অস্ত্র মজুতের একটি বাস্তবচিত্র!

বিশ্বের প্রথম সফল বাণিজ্যিক পার্সোনাল কম্পিউটার