ভয়েজার-১: মহাকাশে ছুটে চলা মানবজাতির সবচেয়ে দূরবর্তী মহাকাশযান!
মহাকাশে পাঠানো এখনো পর্যন্ত মানবজাতির সবচেয়ে দূরবর্তী কৃত্রিম বস্তু (Human-made Object) হলো ভয়েজার-১ (Voyager 1) স্পেস-প্রোব বা মহাকাশযান। ১৯৭৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) এটি উৎক্ষেপণ করে। বর্তমানে এটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬১,০০০ কিলোমিটার (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৭ কিলোমিটার) বেগে মহাকাশে ছুটে চলেছে।
এটি বর্তমানে পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। আর এত বিশাল দূরত্ব থেকে পাঠানো একটি রেডিও সংকেত পৃথিবীতে পৌঁছাতে এখন ২২ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। আর সফটওয়ার আপডেটের মাধ্যমে নাসার বিজ্ঞানীরা ভয়েজার-১ স্পেস-প্রোবের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
আসলে, এটি সত্তর বা আশির দশকের তৈরি একটি পুরনো প্রযুক্তির মহাকাশযান হলেও মহাকাশের অসীম দূরত্বে মানব জাতির ইতিহাস ও অস্তিত্বের চিহ্ন নিয়ে ছুটে চলা এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া, এর পাশাপাশি ১৯৭৭ সালের ২০শে আগস্ট ভয়েজার-২ স্পেস-প্রোব মহাকাশে প্রেরণ করে নাসা।
৭২১.৯ কেজি ওজনের ভয়েজার-১ একটি রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (RTG) থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এতে থাকা প্লুটোনিয়ামের তেজস্ক্রিয় ক্ষয় থেকে উৎপন্ন তাপকে বিদ্যুতে রূপান্তর করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে এটি প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪ ওয়াট শক্তি হারাচ্ছে।
এই কারণে নাসার প্রকৌশলীরা ধীরে ধীরে এর হিটার ও কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্র বা সেন্সর বন্ধ করে শক্তি সাশ্রয়ের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তাদের সতর্ক থাকতে হচ্ছে, যাতে মহাকাশযানটি অতিরিক্ত ঠান্ডা হয়ে জ্বালানি লাইনের পাইপগুলো জমে না যায়। আসলে, প্রযুক্তিগত নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ভয়েজার-১ আজও মানবজাতির মহাকাশ গবেষণার অন্যতম বিস্ময় হিসেবে টিকে রয়েছে।
এটি এখন আমাদের সোলার সিস্টেমের সীমানা অতিক্রম করে আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশ থেকে প্রতিনিয়ত মূল্যবান বৈজ্ঞানিক আজানা তথ্য পৃথিবীতে পাঠিয়ে চলেছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে, আগামী ২০৩০ সালের পর প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ভয়েজার-১ মহাকাশযানের সাথে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
নাসার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৪৯ বছর আগে উৎক্ষেপণের পর ভয়েজার-১ এখনো পর্যন্ত পৃথিবী থেকে প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার দূরত্বের পথ অতিক্রম করেছে। মানবজাতির দৃষ্টিতে এটি অবিশ্বাস্য দূরত্ব বলে মনে হলেও মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় এটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারের দুরত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কারণ, এক আলোকবর্ষের দূরত্ব প্রায় ৯.৪৬ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার (অর্থাৎ ৯,৪৬০ বিলিয়ন কিলোমিটার) হিসেব করা হয়। তাই এক আলোকবর্ষের হিসেবে এটি মাত্র প্রায় ০.২৬৪% পথ অতিক্রম করছে। আবার মহাজাগতিক স্কেলে একক হিসেবে 'পারসেক' ব্যবহার করা হয়, যেখানে এক পারসেক সমান প্রায় ৩.২৬ আলোকবর্ষ।
বর্তমান গতিতে (প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৭ কিলোমিটার) ভয়েজার-১-এর মাত্র এক আলোকবর্ষ পথ অতিক্রম করতেই হয়তো আনুমানিক ১৮,৫৪২ বছর সময় লেগে যেতে পারে। সে সময় পর্যন্ত আধুনিক মানব জাতির অস্তিত্ব টিকে থাকবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকে যায়।
তবে একেবারে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রযুক্তি না হলেও ভয়েজার-১ স্পেস-প্রোব মানবজাতির মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে এখনো টিকে রয়েছে। এছাড়া অদূর ভবিষ্যতে ভয়েজার-১ মহাকাশযানের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও এটি লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ভেতর দিয়ে মানবজাতির ইতিহাস ও চিহ্ন বুকে ধারন করে তার অনন্ত যাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হবে।
নাসার বিজ্ঞানীদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর পরে ভয়েজার-১ Camelopardalis (জিরাফ নক্ষত্রমণ্ডল)-এ অবস্থিত Gliese 445 (AC+79 3888) নামের একটি লাল বামন (Red Dwarf) নক্ষত্রের কাছাকাছি পৌঁছাবে। তখন এটি নক্ষত্রটির প্রায় ১.৬ আলোকবর্ষ দূর দিয়ে অতিক্রম করবে।
এদিকে, আমাদের সূর্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী নক্ষত্র হলো প্রক্সিমা সেন্টুরি। এটি একটি লাল বামন (Red Dwarf) নক্ষত্র এবং এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৪.২৪৬ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। যদিও ভয়েজার-১-এর গতিপথ প্রক্সিমা সেন্টুরির দিকে নয়, তবুও তুলনামূলকভাবে বলা যায়, যদি এটি একই গতিতে সরাসরি প্রক্সিমা সেন্টুরির দিকে অগ্রসর হতো, তাহলে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়তো প্রায় ৮০ হাজার বছরেরও বেশি সময় লেগে যেত।
এই উদাহরণ থেকেই সহজে বোঝা যায় যে, মহাবিশ্বে নক্ষত্রগুলোর মধ্যকার দূরত্ব ঠিক কতটা অকল্পনীয় বিশাল এবং মানব প্রযুক্তির বর্তমান সক্ষমতা এখনো সেই বিশালতার তুলনায় কত সীমিত। ভয়েজার-১ মহাকাশযান আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাবিশ্ব যতই বিশাল ও রহস্যময় হোক না কেন, মানুষের কৌতূহল, অনুসন্ধিৎসা এবং জ্ঞান অর্জনের অদম্য আকাঙ্ক্ষাই মানব সভ্যতাকে নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে ধাবিত করছে।
তথ্যসূত্র: NASA Voyager Mission (JPL), NASA Science ও আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য। কিছু সংখ্যাগত হিসাব লেখকের নিজস্ব গণনা।
লেখক:
সিরাজুর রহমান
শিক্ষক ও লেখক
সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।

Comments
Post a Comment