বায়ুমণ্ডলের ঠিক কতটা উচ্চতায় উড়তে পারে এয়ারক্রাফট?



বর্তমানে সারা বিশ্বে আনুমানিক ৫০টি বা তার অধিক মডেলের যুদ্ধবিমান এবং হেভি কমব্যাট এয়ারক্রাফট সার্ভিসে থাকলেও বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক, ব্যয়বহুল এবং স্টেলথ প্রযুক্তির ফাইটার জেট হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-২২ র্যাপটার যুদ্ধবিমান। এই যুদ্ধবিমানটি আকাশের সর্বোচ্চ প্রায় ৬৫ হাজার ফুট এবং ইউরোফাইটার টাইফুন যুদ্ধবিমান প্রায় ৫৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড্ডয়ন করতে পারে।


এদিকে আমেরিকার তৈরি স্টেলথ বি-২ স্পিরিট হেভি বোমারু বিমান ৫০,০০০ ফুট (প্রায় ১৫,০০০ মিটার) বা তারও বেশি উচ্চতায় উড়তে পারে এবং রাশিয়ার তৈরি লং রেঞ্জের তোপলেভ টিইউ-১৬০ হেভি বোম্বার এয়ারক্রাফট ১৬,০০০ মিটার (৫২,০০০ ফুট) পর্যন্ত উচ্চতায় উড্ডয়নের রেকর্ড রয়েছে।


তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে আকাশের অধিক উচ্চতায় উড্ডয়নের সক্ষমতা রয়েছে মিগ-৩১ ইন্টারসেপ্টর যুদ্ধবিমানের। উইকিপেডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, মিগ-৩১ বিমানটি ২৫,০০০ মিটার (৮২,০০০ ফুট) বা তারও বেশি উচ্চতায় উড্ডয়ন করতে সক্ষম বলে রাশিয়া দাবি করলেও এটি বাস্তবে পূর্ণমাত্রায় পরীক্ষিত নয়; তবুও এটি একটি অত্যন্ত উচ্চতাসম্পন্ন ইন্টারসেপ্টর হিসেবে পরিচিত লাভ করেছে। যদিও এর নির্দিষ্ট অপারেশনাল সিলিং রেঞ্জ সাধারণত ২০,৬০০ মিটার ধরা হয়।


তবে মিগ-৩১ যুদ্ধবিমান ৮২ হাজার ফুট উচ্চতার বেশি উড্ডয়ন না পারলেও কিন্তু ১৯৭৭ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বিমান বাহিনীর একটি মিগ-২৫ (ইন্টারসেপ্টর) যুদ্ধবিমানের পাইলট একটি নিয়ন্ত্রিত ‘controlled zoom climb’-এর মাধ্যমে বিমানটিকে অস্বাভাবিক উচ্চতায় উড্ডয়ন করান। FAI রেকর্ড অনুযায়ী বিমানটি প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছে গিয়ে এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে। যা এখনো পর্যন্ত কোন যুদ্ধবিমানের সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে রয়ে গেছে।


মিগ-২৫ যুদ্ধবিমানের পাইলট এতটা উচ্চতায় উড্ডয়নের বিষয়টি পরিকল্পিত রুটিন মিশনের অংশ ছিল না এবং পরবর্তীতে অবশ্য নিরাপদেই এয়ারবেসে ফিরে আসে বিমানটি। আর এই রেকর্ড আজ পর্যন্ত কোন প্রচলিত যুদ্ধবিমান বা মানুষ চালিত এয়ারক্রাফট ভাঙতে পারেনি।


তবে আকাশের সবচেয়ে উচ্চতায় উড্ডয়নের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড সৃষ্টি করে ইউএস এয়ারফোর্সের অত্যন্ত গোপনীয় মিশনের জন্য তৈরি করা এসআর-৭১ ব্ল্যাক বার্ড এয়ারক্রাফট। ইউকিপিডিয়ার দেয়া তথ্যমতে, এই বিমানের আকাশে উড্ডয়নের ম্যাক্সিমাম ক্যাপাবিলিটি (Service Ceiling) ৮৫,০০০ ফিট। তবে এটি কোন এক গোপন মিশনে এটি ৮৫,০৬৯ ফিট বা ২৫,৯২৯ মিটার উচ্চতায় উড্ডয়ন করে আরেক নতুন রেকর্ড গড়ে।


তাছাড়া এয়ারবাস কর্পোরেশনের তৈরি এ-৩৩০ প্যাসেঞ্জার বিমানটিকে সর্বোচ্চ ৪১ হাজার ১০০ ফুট উচ্চতায় উড্ডয়ন করার উপযোগী করে ডিজাইন করা হয়েছে। তাই কোন এয়ারক্রাফট আনুমানিক ১ লক্ষ ৩০ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছে গেলেও তা কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ভেতরেই রয়েছে বলে বিবেচনা করা হয়।


কারণ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মহাকাশের সীমানা শুরু হয় পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উচ্চতা থেকে। তবে পৃথিবীর পৃষ্ঠের উপরে একটি নির্দিষ্ট কোন উচ্চতায় মহাকাশ শুরু হয় না। এটা হচ্ছে বিজ্ঞানীদের একটি আনুমানিক হিসেব মাত্র।


আসলে কারমান লাইন বা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,২৮,০৮৪ ফুট বা ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) উচ্চতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় মহাকাশের সূচনা হিসাবে মনে করা হয়। এই উচ্চতায় ভুলক্রমে কোন এয়ারক্রাফট পৌঁছে গেলে এয়ারক্রাফট অচল এবং নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যেতে পারে এবং এমনকি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে।


পরিশেষে বলা যায়, টার্বোজেট ও টার্বোফ্যান ইঞ্জিন জ্বালানির দহন প্রক্রিয়ার জন্য বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। ফলে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উচ্চতায় বায়ু ও অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে এ ধরনের ইঞ্জিনচালিত এয়ারক্রাফট টিকে থাকতে পারে না।


তথ্যসূত্র: Wikipedia, NASA, US Air Force fact sheets, FAI records


লেখক পরিচিতি:

সিরাজুর রহমান
শিক্ষক ও লেখক
সিংড়া, নাটোর,
বাংলাদেশ।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ছাপানো পবিত্র কুরআন মাজীদ!

প্রাণের খোঁজে শনির চাঁদ টাইটানে নাসার এক বৈপ্লবিক “ড্রাগনফ্লাই” স্পেস মিশন!

ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তায় মোবাইল নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের বিপ্লব!