এই সুবিশাল মহাবিশ্বে আকাশগঙ্গা ছায়াপথের রহস্যময় যাত্রা!
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মনে করেন, আনুমানিক ৯৩ বিলিয়ন লাইট ইয়ার ব্যাপী দৃশ্যমান মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্যালাক্সি লুকিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথ একটি সুবিশাল সর্পিলাকার গ্যালাক্সি, যার আকার বা ব্যাস প্রায় ১-১.২ লক্ষ আলোকবর্ষ পর্যন্ত হতে পারে।
দীর্ঘ মেয়াদি গবেষণা অনুযায়ী, হয়ত এই ছায়াপথে আনুমানিক ১০০-৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র লুকিয়ে রয়েছে। যদিও রাতের আকাশে আমরা অসংখ্য নক্ষত্র দেখতে পাই, তার অধিকাংশ আমাদের সৌরজগতের কাছাকাছি, কয়েক হাজার আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থান করছে। এছাড়া ছায়াপথে হয়ত কয়েক ট্রিলিয়ন গ্রহ, উপগ্রহ এবং অন্যান্য মহাজাগতিক অবজেক্ট লুকিয়ে থাকতে পারে।
আমাদের চিরচেনা আকাশগঙ্গা ছায়াপথে প্রতিটি নক্ষত্রের মধ্যে এত বিশাল দূরত্ব রয়েছে যে, তাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছাতেও অনেক সময় লাগে। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টৌরি প্রায় ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরে। এটি একটি লাল বামন নক্ষত্র এবং আলফা সেন্টোরি বাইনারি স্টার সিস্টেমের অংশ।
কাল্পনিকভাবে, যদি আমরা প্রতি সেকেন্ডে ২০০ কিলোমিটার গতিতে কোন স্পেসক্রাফট প্রক্সিমা সেন্টুরি নক্ষত্রের দিকে পাঠাই, তবুও সেখানে পৌঁছাতে হয়ত প্রায় ১০ হাজার বছর সময় লাগবে। আর ১৯৭৭ সালে নাসার পাঠানো ভয়েজার-১ স্পেস-প্রোব প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৭ কিলোমিটার গতিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫ বিলিয়ন কিলোমিটার অতিক্রম করেছে। এই গতিতে আমাদের নিকটতম প্রক্সিমা নক্ষত্রের কাছে পৌঁছাতে আনুমানিক ৭০-৮০ হাজার বছর সময় লাগতে পারে।
বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে আকাশগঙ্গা ছায়াপথে কোটি কোটি নক্ষত্র ছড়িয়ে থাকলেও দূরত্ব ও অবস্থানজনিত কারণে তার ৮০% আলো পৃথিবীতে কখনোই পৌঁছায় না। তাই রাতের আকাশে অনেক নক্ষত্র মিটিমিটি করে জ্বললেও দূরত্বের কারণে পুরো আকাশ আলোকিত হয় না।
এদিকে আমাদের ছায়াপথ আমাদের সোলার সিস্টেমসহ তার পুরো পরিবার নিয়ে প্রতিটি সেকেন্ডে প্রায় ২২০ কিলোমিটার গতিতে মহাবিশ্বে ভ্রমণ করছে, অজানা কোনো এক গন্তব্যের দিকে। আর আমাদের সোলার সিস্টেম আকাশগঙ্গার ওরিয়ন বাহুতে অবস্থান করছে, যা গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৬,০০০-৩০,০০০ আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে।
আর এটি স্থানীয় গ্রুপের অংশ এবং ভার্গো সুপারক্লাস্টারের অন্তর্ভুক্ত একটি স্পাইরাল গ্যালাক্সি। তাছাড়া ছায়াপথের কেন্দ্রে রয়েছে এক সুপার-ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল Sagittarius A*, যার ভর কিনা সূর্যের প্রায় ৪.২ মিলিয়ন গুণ বেশি। এছাড়া গ্যালাক্সিতে কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহ, কমেট এবং অজানা মহাজাগতিক কাঠামো রয়েছে।
বিশেষ করে ছায়াপথে রয়েছে নেবুলা বা নিহারিকার মতো অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন মহাজাগতিক কাঠামো। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত প্রায় ৩,০০০ প্ল্যানেটারি নেবুলা শনাক্ত করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে আরও প্রায় ২০,০০০ নেবুলা লুকিয়ে রয়েছে, যা এখনও অনাবিষ্কৃত। নিকটতম নেবুলা Helix Nebula, যা পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৫০ আলোকবর্ষ দূরে কুম্ভ নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত।
আসলে ইন্টারনেটে যেসব আকাশগঙ্গার ছবি আমরা দেখি, তা কিন্তু মোটেও বাস্তব নয়, বরং এটি কম্পিউটার সিমুলেশন বা মডেল। বাস্তবে গ্যালাক্সির মধ্যভাগ থেকে পুরো ছায়াপথের ছবি তোলা সম্ভব নয়। তবে এসব মডেলের মাধ্যমে আমরা ছায়াপথের আনুমানিক আকার ও গঠন সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারি।
পরিশেষে বলা যায়, এই আকাশগঙ্গা ছায়াপথের বিশালতা, রহস্য এবং সৌন্দর্য আমাদের কৌতূহলকে জাগিয়ে রেখেছে। প্রতিটি নতুন গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন আমাদের মহাবিশ্বের গভীর রহস্য উন্মোচন করতে সহায়তা করে। এটি আমাদের শেখায় যে, জ্ঞান, গবেষণা এবং উদ্ভাবনী মনোভাবের কারণে মানবজাতির সামনে এই সুবিশাল মিল্কী ওয়ে গ্যালাক্সির রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: Wikipedia, NASA, ESA, Space.com, নিজস্ব বিশ্লেষণ।
লেখক পরিচিতি:
সিরাজুর রহমান
শিক্ষক ও লেখক
সিংড়া, নাটোর,
বাংলাদেশ।

Comments
Post a Comment