এক অজানা আউটার স্পেস ওয়ার-এর ঝুঁকির মুখে বিশ্ব!




সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো মহাকাশে অত্যন্ত রহস্যজনক এবং অতি উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক স্যাটেলাইট বা মহাকাশযান প্রেরণ করছে। যা বিশ্বকে এক নতুন “আউটার স্পেস ওয়ার”-এর ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। জাতিসংঘের UNOOSA প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালে স্বাক্ষরিত “আউটার স্পেস ট্রিটি” এখনো কার্যকর থাকলেও বিশ্বের প্রভাবশালী এবং সামরিক ক্ষমতা সম্পন্ন দেশগুলো এই আন্তর্জাতিক চুক্তি অমান্য করে নিজেদের পরিকল্পনা মাফিক মহাকাশে সামরিক ও নজরদারি স্যাটেলাইট প্রেরণ করে যাচ্ছে।

 

 

 

যুক্তরাষ্ট্রের পেন্টাগন সম্প্রতি সতর্ক করেছে যে, রাশিয়া মহাকাশে গোপনে এমন কিছু স্যাটেলাইট মোতায়েন করেছে যেগুলোকে তারা “কিলার স্যাটেলাইট” বলে প্রচার করে। এসব স্যাটেলাইটে হয়ত নিউক্লিয়ার ওয়েপন্স, বায়োলজিক্যাল, লেজার কিংবা ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক পালস (ইএমপি) জাতীয় ভয়ঙ্কর অস্ত্র মোতায়েন করা থাকতে পারে। যা সরাসরি ন্যাটো জোটের দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। একই সময়ে চীনও খুব সম্ভবত রাশিয়ার সাথে সমন্বয় করে সন্দেহজনক সামরিক স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

 

 

 

তবে এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো যে, আমেরিকার এসব অভিযোগের বিপরীতে চীন ও রাশিয়ার পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত ও প্রকাশ্য আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, স্বীকারোক্তি কিংবা পালটা অভিযোগ পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশ-ভিত্তিক সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘কৌশলগত নীরবতা’ বা strategic ambiguity ইচ্ছাকৃতভাবে বজায় রাখা হয়, যাতে প্রকৃত সক্ষমতা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রতিপক্ষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। ফলে এই নীরবতা দেশগুলোর আউটার স্পেস ওয়ার বা মহাকাশে চলমান সামরিক উপস্থিতিকে আরও রহস্যময় ও উদ্বেগজনক করে তুলছে।

 

 

 

আসলে গত ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বের প্রথম সারির সামরিক সুপার পাওয়ার দেশগুলো মহাকাশে সামরিক উপস্থিতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করছে। আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী মহাকাশে কোনো ধরনের প্রাণঘাতী এবং অপ্রচলিত অস্ত্র মোতায়েন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীন নিজেদের মতো করে মহাকাশে সামরিক ও নজরদারি স্যাটেলাইট প্রেরণ করছে, যার ফলে বর্তমানে ১৯৬৭ সালের “আউটার স্পেস ট্রিটি” অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যা অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর সার্বিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে।

 

 

 

আউটার স্পেস ট্রিটি (Outer Space Treaty) হলো ১৯৬৭ সালের একটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। যা মহাকাশে সামরিক ও যুদ্ধ সংক্রান্ত গবেষণা ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে এবং মহাকাশকে শুধু মানবজাতির কল্যাণে ও শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত রাখার বিষয় বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো একমত হয়। এই চুক্তি অনুসারে মহাকাশে কোনো অবজেক্ট কেউ মালিকানা দাবি করতে পারবে না, এবং এর পাশাপাশি কোন ধরণের অস্ত্র প্রেরণ কিংবা সামরিক কার্যকলাপ সকলের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।

 

 

 

এই চুক্তির মূল নীতি হলো মহাকাশে কোন দেশ অভিযান প্রেরণ করলে তা সার্বিকভাবে মানিবজাতি বা বিশ্বের সকল দেশের পক্ষ থেকে করা হয়েছে বলে গণ্য করা হবে এবং ইউম্যান স্পেস মিশন সকলের উপকারে ও বিশ্ব শান্তির জন্য পরিচালিত করতে হবে বলে একমত হন বিশ্ব নেতারা।

 

 

এই আউটার স্পেস ট্রিটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ও নীতিগুলো হলো:

 

(১) মালিকানা নিষিদ্ধ: কোনো দেশ বা ব্যক্তি মহাকাশের কোনো অংশ বা চাঁদ বা অন্য কোনো গ্রহ-উপগ্রহের মতো কোনো মহাজাগতিক অবজেক্টের মালিকানা দাবি করতে পারে না।

 

(২) শান্তিপূর্ণ ব্যবহার: মহাকাশ অভিযান শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে এবং এতে যে কোনো ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র (WMD) স্থাপন বা মোতায়েন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।

 

(৩) সবার জন্য উন্মুক্ত: মহাকাশে গবেষণা, অনুস্ন্ধান ও ব্যবহার সকল দেশের সুবিধা ও স্বার্থে করা হবে এবং এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

 

(৪) সামরিক নিষেধাজ্ঞা: মহাকাশে সামরিক ঘাঁটি, স্থাপনা, বা কোনো ধরনের বিপদজনক অস্ত্র মোতায়েন কিংবা পরীক্ষা করা যাবে না।

 

 

 

তবে গত ২০২৪ সালের দিকে চীন গোপনে মহাকাশে একটি অজানা স্যাটেলাইট বা স্পেসক্রাফট প্রেরণ করেছে বলে পশ্চিমা মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এখন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে প্রকাশ্যেই তাদের রহস্যময় মহাকাশযান এক্স-৩৭বি নতুন মিশনে পাঠিয়েছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটে উৎক্ষেপিত এই সামরিক অবজেক্ট বা মহাকাশযানটি উন্নত লেজার কমিউনিকেশন ও কোয়ান্টাম সেন্সর বহন করছে বলে মনে করা হয়। যদিও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখা হয়েছে, ধারণা করা হয় এটি চীন ও রাশিয়ার মহাকাশে পাঠানো গোপন সামরিক বা কিলার স্যাটেলাইটের উপর নজরদারির জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

 

 

অন্যদিকে আমেরিকার পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনও নিজেদের বিশেষ মহাকাশ বাহিনী ইতোমধ্যেই হয়ত গঠন করেছে। রাশিয়া সম্প্রতি অজানা সংখ্যক সামরিক স্যাটেলাইট কক্ষপথে পাঠিয়েছে, যেগুলোকে পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা “ডুয়াল-ইউজ” প্রযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যা খুব সম্ভবত মহাকাশ বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার আড়ালে প্রয়োজনে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে। চীনও একইভাবে প্রতিনিয়ত উচ্চ প্রযুক্তির স্যাটেলাইট মহাকাশে প্রেরণ করে যাচ্ছে, যা প্রচলিত প্রযুক্তি দ্বারা শনাক্ত করা কঠিন এবং তা হয়ত শত্রু দেশের স্যাটেলাইটকে মহাকাশেই ধ্বংস করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়।

 

 

 

বর্তমানে মহাকাশে সামরিক ও নজরদারি স্যাটেলাইট প্রেরণের দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মহাকাশে এখনো পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৪৭, রাশিয়ার ১১০ এবং চীনের ১৫৭টি সামরিক ও উচ্চ প্রযুক্তির নজরদারি স্যাটেলাইট সক্রিয় অবস্থায় মোতায়েন রয়েছে। নতুন এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে মহাকাশ এখন সামরিক সুপার পাওয়ার দেশগুলোর মধ্যে চলমান “আউটার স্পেস ওয়ার” বা সরাসরি সামরিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, এই ভয়াবহ মহাকাশ যুদ্ধের প্রতিযোগিতা হয়তো আরও কয়েক দশক ব্যাপী চলতে থাকবে এবং সর্বপরি এর বিরূপ প্রভাব মানবজাতিকেই বহন করতে হবে।

 

 

 

 

মহাকাশে চলমান “আউটার স্পেস ওয়ার” প্রতিযোগিতা শুধু সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, বরং পৃথিবীর কক্ষপথে বিপজ্জনক হারে স্পেস জাঙ্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর রেডিয়েশন ছড়িয়ে পড়ছে। তাছাড়া ১৯৫৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর কক্ষপথে কয়েক হাজার অচল স্যাটেলাইট ও রকেটের অংশ মিলিয়ে প্রায় ৩৬-৪০ হাজারের বেশি বড় স্পেস ডেব্রিস এবং মিলিয়ন মিলিয়ন ছোট টুকরো জমে গেছে, যা মহাকাশকে ভয়াবহ রকমের স্পেস জাঙ্কে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি অদূর ভবিষ্যতে যদি নিউক্লিয়ার ওয়েপন্স, বায়োলজিক্যাল, লেজার কিংবা ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক পালস (ইএমপি) জাতীয় ভয়ঙ্কর অস্ত্র মহাকাশে মোতায়েন করা হয়, তবে তা এক অচিন্তনীয় বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

 

 

 

তাছাড়া এন্টি স্যাটেলাইট মিসাইল গবেষণায় বর্তমানে আমেরিকা, চীন এবং রাশিয়ার পর ভারত তার নিজের যোগ্য স্থান করে নিয়েছে। এই দেশগুলো এখন ভূ-পৃষ্ঠ থেকেই নিজস্ব প্রযুক্তির শক্তিশালী মিসাইল সিস্টেম দ্বারা মহাকাশে থাকা অন্য কোন দেশের সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রিয় স্যাটেলাইট সরাসরি ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। আর নতুন এই প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় গত কয়েক বছরে চীন ও ভারত মহাকাশে তাদের নিজস্ব বেশকিছু অচল স্যাটেলাইট পরীক্ষামূলকভাবে মিসাইল হিট করে ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে নতুন করে মহাকাশে বিপুল পরিমাণ স্পেস-জাঙ্ক বা স্যাটেলাইট আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ার মতো ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।

 

 

 

তবে আশার কথা হলো যে, বিশ্বের সামরিক সুপার পাওয়ার দেশগুলোর মধ্যে চলমান এই ভয়াবহ বা আশঙ্কাজনক আউটার স্পেস ওয়ার” প্রস্তুতির মধ্যেও আন্তর্জাতিক মহলে এখন নতুন করে মহাকাশে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা মোতায়েন নিষিদ্ধ করে চুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রকাশ্যে না বললেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন কেউই এখন আর নিজেদের সামরিক মহাকাশ কর্মসূচি বন্ধ করতে রাজি নয়। ফলে পৃথিবী ও মানবজাতি নতুন করে হয়ত এক অজানা ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

 

 

পরিশেষে বলা যায়, চলতি ২০২৫ সালের শেষে এসে এটা স্পষ্ট যে, মহাকাশে সামরিক তৎপরতা ও অস্ত্র প্রতিযোগিতা আর কিন্তু গোপন নেই, বরং শক্তিধর দেশগুলো এখন প্রকাশ্যেই একে অপরের বিরুদ্ধে পেশি শক্তি প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে। এমনকি দেশগুলো হয়ত ইতোমধ্যেই তাদের স্পেশাল স্পেস মিলিটারি ফোর্স গঠন করে ফেলেছে, যাতে অদূর ভবিষ্যতে শত্রু দেশগুলোর বিরুদ্ধে মহাকাশ থেকে সরাসরি আঘাত হানা যায়। এই অশুভ প্রতিযোগিতায় এক দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদিকে রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে জোট গঠন করে তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

 

 

 

তথ্যসূত্র: জাতিসংঘের UNOOSA প্রতিবেদন, ESA, ইউকীপিডিয়া, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এনসিবি নিউজ, স্পেস নিউজ, সিএনএন, গ্লোবাল টাইমস এবং নিজস্ব বিশ্লেষণ।

 

 

 

লেখক পরিচিতি:

 

সিরাজুর রহমান

শিক্ষক ও লেখক

গ্রাম-ছোট চৌগ্রাম, সিংড়া, নাটোর

বাংলাদেশ।

 

 

Comments