শিক্ষিত বেকারত্ব থেকে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই বিশাল শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে তার প্রত্যাশিত প্রতিফলন এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। তবে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের শিল্পায়নকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার ক্ষেত্রেও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে স্নাতক পাস করা তরুণের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ৫৭ হাজার এবং নারী ৩ লাখ ২৮ হাজার। গত আট বছরে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ দেশের শিল্প-কারখানাগুলোতে এখনো দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ এবং আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন কর্মীর ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বাস্তবে দেশে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়ে গেছে।
ফলে দেশের তরুণদের উচ্চ শিক্ষা অর্জন ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান লক্ষ্য করা যায়। এই বিশাল শিক্ষিত জনশক্তি নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি বড় সম্পদ। তবে তাদের যথাযথ দক্ষতা, উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা না গেলে এ সম্ভাবনা পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগানো কঠিন হবে।
বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে শক্তিশালী গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) অবকাঠামোর অভাব থাকায় শিল্প খাতের কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশের জন্য আমরা এখনো অনেকাংশে বৈশ্বিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তবে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের সামনে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে দেশে কয়েক শতাধিক বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিভিত্তিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণার ক্ষেত্র রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে শিল্পখাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা গেলে গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করে একটি শক্তিশালী ও যুগোপযোগী দক্ষতা-নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সহজ হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারও বিভিন্ন পর্যায়ে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো তৈরি পোশাক (RMG) শিল্প। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার প্রায় ৮১ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই শিল্প দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অসাধারণ অবদান রাখলেও এর সমপর্যায়ের আরেকটি শক্তিশালী ও বিকল্প রপ্তানিমুখী শিল্পখাত এখনো গড়ে ওঠেনি।
বিশ্ববাজারে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। ২০২৫ সালে ভিয়েতনাম প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার এবং ভারত প্রায় ৪৪১.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বর্তমানে অনেক কম, তবে সম্ভাবনার দিক থেকে বাংলাদেশ কিন্তু মোটেও পিছিয়ে নেই।
বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ ভিয়েতনামের সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে পোশাক শিল্পের পাশাপাশি ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও রপ্তানিতে তাদের ব্যাপক বিনিয়োগ। শিল্প বৈচিত্র্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে।
তবে এখন শুধু রপ্তানি আয় নয়, বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড।
এই অর্জনকে আরও এগিয়ে নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে আমাদের। যদি দেশের জনশক্তিকে আরও বেশি কারিগরি দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
একই সঙ্গে অধিক সংখ্যক দক্ষ কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি সঠিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বার্ষিক রেমিট্যান্স আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আজকের বিশ্বে শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং দক্ষতানির্ভর শিক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেশের বিশাল শিক্ষিত যুবসমাজকে প্রথাগত তাত্ত্বিক শিক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কারিগরি শিক্ষা এবং বিশেষায়িত কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সঙ্গে আরও ব্যাপকভাবে যুক্ত করতে হবে।
এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণরা দেশের শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, গবেষণা, উদ্ভাবন, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স আয় সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে নতুন শিল্পখাত গড়ে ওঠার মাধ্যমে শিক্ষিত বেকারত্ব কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক ও শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী বিশ্বমানের কর্মী তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অদূর ভবিষ্যতে একটি স্বনির্ভর, উদ্ভাবনমুখী এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত তথ্যসূত্র এবং লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ।
লেখক: সিরাজুর রহমান
শিক্ষক ও লেখক
সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ

Comments
Post a Comment