বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং: গবেষণার প্রকৃত চিত্র নাকি খ্যাতির দাপট?
লেখকঃ সিরাজুর রহমান
আপডেটঃ ২৫ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমানে সারাবিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান যাচাইয়ের জন্য QS World University Rankings এবং Times Higher Education (THE) World University Rankings-কে অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতি বছর প্রকাশিত এসব র্যাংকিং শিক্ষার্থী, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।
কিন্তু এখানে মূল প্রশ্ন হলো — বৈশ্বিকভাবে প্রভাবশালী এসব র্যাংকিং সংস্থা কি সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার গভীরতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও সামগ্রিক অবদানকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে? নাকি এটি একটি খ্যাতি-কেন্দ্রিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাড়তি সুবিধা দেয়?
এখানে প্রকাশ থাকে যে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক QS এবং THE-এর মূল্যায়ন পদ্ধতি মূলত দুটি বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয় — ‘রেপুটেশন’ এবং ‘আন্তর্জাতিকীকরণ’। QS-এর মোট স্কোরের ৪০% আসে জরিপ থেকে। THE-এর ৩৩% স্কোরও জরিপভিত্তিক। এই জরিপে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশি পরিচিত, ফলে তারা সহজেই ভালো স্কোর পায়।
আবার QS-তে ১০% এবং THE-তে ৭.৫% স্কোর নির্ভর করে বিদেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যার ওপর। বিশেষ করে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন বিদেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক রয়েছেন, তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ধরা হয়। এক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার দেশগুলো এই সূচকে এগিয়ে থাকে এবং অ-ইংরেজি দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
অন্যদিকে, ARWU এবং Leiden Ranking-এর মতো র্যাংকিং সংস্থাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উদ্ভাবন সক্ষমতা এবং গবেষণার বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। ARWU গবেষণার আউটপুট ও উদ্ধৃতিকে অধিক গুরুত্ব দেয়। Leiden Ranking উদ্ধৃতির ‘প্রভাব’ পরিমাপ করে, যা গবেষণার প্রকৃত গভীরতা বোঝাতে সহায়ক হয়ে থাকে।
তবে সাংহাইভিত্তিক ARWU-তেও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেখানে নেচার ও সায়েন্স-এর মতো ইংরেজি জার্নালকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে চীনা, ফার্সি, হিন্দি, তুর্কী কিংবা রুশ ভাষায় আন্তর্জাতিক কিংবা স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সহজে সেখানে স্থান পায় না। ফলে বৈশ্বিকভাবে প্রভাবশালী অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হিসেবের বাইরে থেকে যেতে পারে।
এছাড়া, Leiden Ranking-এর মতো ডেটা-নির্ভর র্যাংকিং তুলনামূলকভাবে ন্যায্য হলেও তা বৈশ্বিক পর্যায়ে মূলধারার আলোচনায় তেমন প্রভাব ফেলে না। সারাবিশ্বে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত QS ও THE-ই বেশি পরিচিত ও জনপ্রিয় কিংবা গ্রহণযোগ্য সোর্স হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আলোচনার স্বার্থে এখানে উল্লেখ্য যে, চীন গত দুই দশকে গবেষণায় অভাবনীয় অগ্রগতি করেছে। ARWU ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, চীনের ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের শীর্ষ ১০০-এর মধ্যে এবং ২৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ১০০০-এর মধ্যে রয়েছে। আর এশিয়ার শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় (১৮তম)।
বিশেষ করে, ন্যানো প্রযুক্তি, রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, ও পদার্থবিজ্ঞানে চীনের অবস্থান বিশ্বের শীর্ষে উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে — ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বে মোট ১০৭.৮ লক্ষ ন্যানো পেটেন্টের মধ্যে ৪৬.৪ লক্ষ পেটেন্ট চীনের। এটি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মোট পেটেন্টের চেয়েও বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের কিছু স্বল্প পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ষষ্ঠ প্রজন্মের কমব্যাট এয়ারক্রাফট টেকনোলজি নিয়ে গবেষণা চলছে, যা এক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত বিশ্বের অন্য কোনো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও সম্ভব হয়নি।
অথচ QS বা THE-তে চীনের সুচৌ বিশ্ববিদ্যালয় বা সাংহাই জিয়াও টং-এর মতো উচ্চমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যথাযোগ্য স্থান পায় না। তারা ন্যানো প্রযুক্তি ও নিউক্লিয়ার প্রকৌশলে বিশ্বমানের গবেষণা করলেও বাস্তবে একাধিক বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ে।
শুধু চীন নয়, বৈশ্বিকভাবে প্রভাবশালী ইরান, ভারত, তুরস্ক, রাশিয়ার মতো প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশগুলোর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। বর্তমানে ইরান ন্যানো প্রযুক্তি উৎপাদনে বিশ্বে ৫ম এবং নিউক্লিয়ার প্রকৌশলে ৪র্থ শীর্ষ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়া ইরান ও তুরস্কের কমব্যাট ড্রোন টেকনোলজি সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে, ভারত বর্তমানে মহাকাশ ও মেডিসিন গবেষণায় বিশ্বমানের সাফল্য পেলেও দেশটির প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো QS বা THE র্যাংকিংয়ে যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরমাণু, জ্বালানি, ডিফেন্স টেকনোলজি ও পদার্থবিজ্ঞান গবেষণায় এগিয়ে থাকলেও বাস্তবে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে তারা পিছিয়ে পড়ছে।
বাস্তবতা হলো, বর্তমান বৈশ্বিক পর্যায়ে স্বীকৃত র্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রচলিত সূচকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার প্রকৃত গভীরতা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছে না। এটি একটি ‘খ্যাতি-কেন্দ্রিক’ ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পশ্চিমা ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলো এতে সুবিধা পায় এবং অন্যান্য অঞ্চলের ডেডিকেটেড অ-ইংরেজি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত হয়।
প্রস্তাবনা:
১. র্যাংকিং সংস্থাগুলোকে উদ্ভাবন ও পেটেন্ট-ভিত্তিক সূচক অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
২. ভাষাগত বৈচিত্র্য স্বীকার করে অ-ইংরেজি জার্নালের গবেষণাকেও যথাযথভাবে মূল্যায়নে আনতে হবে।
৩. Leiden Ranking-এর মতো ডেটা-নির্ভর মডেলকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
৪. আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি স্থানীয় গবেষণার প্রভাব পরিমাপের জন্য আলাদা সূচক তৈরি করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, একবিংশ শতাব্দির চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল খ্যাতি অর্জন নয়, বরং জ্ঞানের সীমানা প্রসারিত করা এবং মানবসভ্যতার কল্যাণে ও উন্নয়নে অবদান রাখা। র্যাংকিং যদি সেই উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তবে তার পুনর্মূল্যায়ন সময়ের দাবি রাখে।
(ইন্টারনেটে প্রাপ্ত উন্মুক্ত উৎস থেকে তথ্য সংগৃহীত এবং নিজস্ব বিশ্লেষণ)
তথ্যসংগ্রহকারী ও লেখক: সিরাজুর রহমান, শিক্ষক ও লেখক (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক), সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ।

Comments
Post a Comment