যুদ্ধ ও বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে ইরানের গবেষণা নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা!
লেখক: সিরাজুর রহমান
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের নিজস্ব উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার মান ও কার্যক্রম নিয়ে বিশ্বব্যাপী নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও উচ্চস্তরের গবেষণা ও উদ্ভাবনে অসাধারণ সাফল্য দেখাচ্ছে।
মূলত, গত ১৮ জুন প্রকাশিত QS World University Rankings 2027-এ ইরানের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চস্তরের প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ অনেকটাই সীমিত হলেও বাস্তবে দেশটির ন্যানোপ্রযুক্তি, রসায়ন, বেসামরিক পরমাণু, ডিফেন্স সিস্টেম এবং ফার্মাকোলজিতে ইরানের গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সদ্য প্রকাশিত QS World University Rankings 2027-এ এবার ইরানের মোট ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম স্থান পেয়েছে। QS মূলত গবেষণার মান পরিমাপের জন্য যে 'প্রতি ফ্যাকাল্টিতে সাইটেশন' সূচকটি ব্যবহার করে, সেখানে ইরানের স্কোর অত্যন্ত উচ্চস্থানে রয়েছে। তবে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংখ্যা অনেকটাই সীমিত হওয়ায় সার্বিক স্কোরের বিবেচনায় যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
QS World University Rankings 2027-এর এক্সেল সিট অনুযায়ী, ইরানের দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তেহরান ইউনিভার্সিটি (সামগ্রিক স্কোর ৪০.৮) গ্লোবাল র্যাংকিং এ ৩৬৭তম স্থানে রয়েছে। এর সাইটেশন স্কোর ৮৯.৯, যা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বমানের গবেষণার ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া, শারিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (সামগ্রিক স্কোর ৩৮.৮) রয়েছে ৩৯০তম স্থানে এবং প্রতিষ্ঠানটির সাইটেশন স্কোর হচ্ছে ৯৪.৯, যা প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে তাদের দক্ষতা প্রমাণ দেয়।
তালিকায় ৪৮৪তম স্থানে থাকা আমিরকাবির ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (সামগ্রিক স্কোর ৩৩.২) সাইটেশন স্কোর ৯৯.৯ পেয়েছে, যা বিশ্বের শীর্ষ মাত্র ১% বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিজের যোগ্য স্থান করে নিয়েছে। আর, ৫০৫তম স্থানে থেকে ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (সামগ্রিক স্কোর ৩২.২) এবং এর সাইটেশন স্কোর হচ্ছে ১০০.০, যা এই সূচকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ স্কোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এর পাশাপাশি, তালিকায় ৬২৪তম স্থানে থাকা ইরানের ইসফাহান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (সামগ্রিক স্কোর ২৭.৮) সাইটেশন স্কোর ৯৪.১ পেয়েছে। অন্যদিকে, ইউনিভার্সিটি অন তাবরিজ, শাহিদ বেহেশতি ইউনিভার্সিটি এবং শিরাজ ইউনিভার্সিটি গ্লোবাল র্যাংকিং এ যথাক্রমে ৬৮৯তম, ৭৮৭তম এবং ৭৯৭তম স্থানে নিজের যোগ্য স্থান করে নিয়েছে।
একাধিক আন্তর্জাতিক জরিপ ও ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উচ্চস্তরের ন্যানোপ্রযুক্তি গবেষণায় ইরান বিশ্বে চতুর্থ শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে, যা চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের পরেই নিজের নাম লিখিয়েছে। বিশেষ করে, ইরানের শারিফ ইউনিভার্সিটি এবং তেহরান ইউনিভার্সিটি প্রতি বছর ন্যানো-ম্যাটেরিয়ালস বিষয়ে কয়েকশ উচ্চ-মানের গবেষণাপত্র প্রকাশ করে।
তবে QS-এর মতো আন্তর্জাতিক ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং-এ ইরানের অবস্থান তুলনামূলকভাবে কম দেখানো হয়। এর প্রধান কারণ হলো, এই র্যাংকিং-এ আন্তর্জাতিক ফ্যাকাল্টি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংখ্যা ও অংশগ্রহণ অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। নিষেধাজ্ঞার কারণে স্বাভাবিকভাবেই ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থী খুবই কম হয়ে থাকে। যার ফলে, এই সূচকগুলোতে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রায় শূন্য পেয়ে থাকে।
অথচ, সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ইরানের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও মৌলিক গবেষণার মান বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবেই এখন সারাবিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইরানের বিজ্ঞানীরা প্রতি বছর আন্তর্জাতিক জার্নালে ৭০ হাজারের বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা মধ্যপ্রাচ্য ও অত্র অঞ্চলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
তেহরান ইউনিভার্সিটি এবং শারিফ ইউনিভার্সিটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে এশিয়ার সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্থান পায়। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান স্পেস টেকনোলজি, স্টেম সেল থেরাপি এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বর্তমানে, ইরানের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ, এবং তাদের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রবল আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়।
তাই পরিশেষে বলা যায়, অদূর ভবিষ্যতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে, ইরান খুব দ্রুত বিশ্বের শীর্ষ গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের শক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। আর এক্ষেত্রে ইরান প্রমাণ করেছে যে, বিজ্ঞান ও ইতিবাচক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কোনো বাধা ও অজুহাত মানেনা। ন্যানোপ্রযুক্তি থেকে জিনতত্ত্ব, মিসাইল সিস্টেম কিংবা পরমাণু গবেষণায় আজ বিশ্ব মঞ্চে এক অনন্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইরান।
তথ্যসূত্র: QS World University Rankings 2027 official data
লেখক পরিচিত: সিরাজুর রহমান, শিক্ষক ও লেখক, বাংলাদেশ।
.png)
Comments
Post a Comment