কারমান লাইন: যেখানে শুরু হয় মহাকাশের সীমানা!
পৃথিবীর আকাশের শেষ সীমা কোথায়, আর ঠিক কোথা থেকে মহাকাশ শুরু হয়েছে—এই প্রশ্ন হয়ত অনেকের মনেই জাগতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় মহাকাশের এই কাল্পনিক সীমানাটি শুরু হয় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) উচ্চতা থেকে, যাকে বলা হয় ‘কারমান লাইন’ (Kármán Line)।
কারমান লাইন আকাশের ওপর কোনো দৃশ্যমান রেখা নয়, বরং এটি একটি কাল্পনিক বৈজ্ঞানিক রেফারেন্স পয়েন্ট। এই উচ্চতায় বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব এতটাই কমে যায় যে, সাধারণ বিমানের পক্ষে ডানা ব্যবহার করে উড্ডয়ন করা বা পর্যাপ্ত লিফট (Lift) তৈরি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞানীরা তাই প্রায় ১০০ কিলোমিটার উচ্চতাকেই মহাকাশ শুরুর প্রাথমিক সীমা হিসেবে বিবেচনা করেন। এই উচ্চতায় জেট ইঞ্জিনচালিত এয়ারক্রাফট নয়, বরং কেবল রকেট বা মহাকাশযান নিজস্ব জ্বালানি ব্যবহার করে টিকে থাকতে পারে।
কারমান লাইন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের থার্মোস্ফিয়ার স্তরের মধ্যে অবস্থিত। এর আরও ওপরে ধীরে ধীরে শুরু হয় এক্সোস্ফিয়ার, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে বিবেচিত। এই সীমারেখাটি মূলত একটি বৈজ্ঞানিক রেফারেন্স, যেখানে বায়ুর ঘনত্ব এত কম হয় যে, এখানে প্রচলিত বিমান প্রযুক্তি কার্যকর থাকে না।
তবে এটা ঠিক যে, ১০০ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছানো মানেই স্থায়ীভাবে মহাকাশে অবস্থান করা নয়। কোনো মহাকাশযানকে পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে টিকে থাকতে হলে প্রায় ৭.৯ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড কক্ষপথগত গতি (Orbital Velocity) অর্জন করতে হয়। আর এই গতি অর্জন করতে পারলেই একটি বস্তু পৃথিবীর চারপাশে কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করতে পারে।
হাঙ্গেরি-আমেরিকান প্রকৌশলী ও পদার্থবিদ থিওডোর ভন কারমান প্রথম এই সীমা নিয়ে তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৮৩.৮ কিলোমিটার উচ্চতার পর বায়ুর ঘনত্ব এত কম হয়ে যায় যে, বিমানের অ্যারোডাইনামিক লিফট কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
যদিও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ১০০ কিলোমিটার উচ্চতাকেই মহাকাশ শুরুর সীমা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংস্থা FAI (Fédération Aéronautique Internationale) এই কারমান লাইনকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাকাশ শুরুর সীমানা হিসেবে বিবেচনা করে।
এর একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায় ১৯৭৭ সালে। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পাইলট আলেকজান্ডার ফেদোটভ একটি বিশেষ MiG-25 যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত ‘Zoom Climb’ পদ্ধতিতে প্রায় ১,২৩,৫২০ ফুট (৩৭.৬৫ কিলোমিটার) উচ্চতায় পৌঁছে একটি বিশ্ব রেকর্ড সৃষ্টি করেন।
এটি এখন পর্যন্ত কোনো জেট ইঞ্জিনচালিত এয়ারক্রাফটের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছানোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য রেকর্ড। তবে সেই উচ্চতাতেও বাতাসের ঘনত্ব এতটাই কম ছিল যে, বিমানটি তার স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ প্রায় অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছিল। যদিও পরবর্তীতে বিমানটি নিরাপদে মাটিতে নেমে আসতে সক্ষম হয়।
এটি দেখায় যে, এর আরও অনেক উপরে, অর্থাৎ প্রায় ১০০ কিলোমিটার উচ্চতায়, বাতাসের ঘনত্ব এত কম যে কোনো প্রচলিত বিমানের পক্ষে সেখানে কার্যকরভাবে উড্ডয়ন করা সম্ভব নয়। যদিও ১৯৬৩ সালে নাসার একটি রকেট ইঞ্জিনচালিত এক্স-১৫ এয়ারক্রাফট আরও অনেক উচ্চতায় (১০৭.৮ কিলোমিটার) পরীক্ষামূলকভাবে উড্ডয়ন করে এক বিরল রেকর্ড গড়ে।
কারমান লাইনের একটি বিশেষ গুরুত্ব হলো যে, এটি বিমান আইন (Air Law) এবং মহাকাশ আইন (Space Law)–এর মধ্যে একটি তাত্ত্বিক সীমারেখা নির্দেশ করে। আর সাধারণভাবে ধরা হয়, যারা এই ১০০ কিলোমিটার সীমা অতিক্রম করেন, তারাই আনুষ্ঠানিকভাবে মহাকাশচারী বা নভোচারী হিসেবে বিবেচিত হন।
পরিশেষে বলা যায়, কারমান লাইন এখন শুধু একটি কাল্পনিক রেখাই নয়, বরং এটি মানব জাতির এভিয়েশন প্রযুক্তির সীমা ও মহাকাশ অনুসন্ধানের সূচনাবিন্দুর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রতীক হিসেবে টিকে রয়েছে।
তথ্যসূত্র : Wikipedia, NASA, Fédération Aéronautique Internationale (FAI), Encyclopaedia Britannica
ইমেজ: AI Generated
লেখক পরিচিতি:
সিরাজুর রহমান
শিক্ষক ও লেখক
সিংড়া, নাটোর, বাংলাদেশ

Comments
Post a Comment